Ultimate magazine theme for WordPress.

চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জে খেজুর গুড়ের হাট জমে উঠেছে।

0
২০৯ Views

রানা আহম্মেদ,চুয়াডাঙ্গা উপজেলা প্রতিনিধি:

চুয়াডাঙ্গার জেলার ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জের খেজুর গুড়ের হাট জমে উঠেছে। চাহিদা বেশি হওয়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত গুড় নিয়ে আসছেন। স্বাদে ও গন্ধে এ গুড় অতুলনীয় হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এ হাটে ছুটে আসছেন বেপারিরা। প্রতি হাটে প্রায় কোটি টাকার গুড় বেচাকেনা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে এই গুড়।

প্রতি বছরের ন্যায় এবার চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সরোজগঞ্জ বাজারে বেশ জমজমাট খেজুর গুড়ের হাট। সপ্তাহে সোম ও শুক্রবার বসে গুড়ের হাট। সারি সারি সাজানো থাকে গুড়ের পাত্র (ভাঁড়)। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত শত শত কৃষক, বেপারি ও শ্রমিকদের উপস্থিতিতে ওই এলাকা থাকে সরগরম। এক ভাঁড় গুড় আকারভেদে বিক্রি হয় ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। বেপারিরা নলেন ও ঝোলা গুড় দেখে দরদাম ঠিক করে ওজন দিয়ে ট্রাকে তুলে নিয়ে যান।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরোজগঞ্জ গুড়ের হাট থেকে প্রতিদিন ২০-২৫ ট্রাক গুড় কিনে নিয়ে যান বেপারিরা। প্রতি হাটে প্রায় এক কোটি টাকার গুড় বেচাকেনা হয়। এছাড়া প্রতি মৌসুমে ২৪-২৮ কোটি টাকার বেচাকেনা হয় এ হাটে। আর দিনের হিসাবে ২০০-২৫০ টন গুড় কিনে নিয়ে যান পাইকাররা। দেশজুড়ে চুয়াডাঙ্গার খেজুরের গুড় ও পাটালির সুখ্যাতি রয়েছে। স্বাদে-গন্ধেও অতুলনীয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খেজুর গুড় ও নলেন পাটালি বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে এখন জমজমাট ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জ হাট। চুয়াডাঙ্গা-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণে সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের সরোজগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে শীত মৌসুমে সপ্তাহে দুদিন এ গুড়ের হাট বসে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজারের মতো খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার ৯৩ হাজার, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৩৫ হাজার, দামুড়হুদা উপজেলায় ৮৩ হাজার ও জীবননগর উপজেলায় ৩৬ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে।

প্রতিটি গাছ থেকে এক মৌসুমে অন্তত ১২ কেজি গুড় পাওয়া যায়। সে হিসেবে জেলায় তিন হাজার মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। প্রতি মেট্রিক টন ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। সে অনুযায়ী চলতি মৌসুমে ২৪ থেকে ২৮ কোটি টাকার খেজুর গুড় বেচাকেনা হবে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয় মাঠে কৃষকরা গুড়ভর্তি মাটির ভাঁড় ও বেতের তৈরি পাত্রে (ধামায়) করে নলেন পাটালি নিয়ে বসে আছেন। বাতাসে ভেসে আসছে মিষ্টি একটা গন্ধ। ক্রেতার হাতে থাকা লোহার শিক দিয়ে গুড় ও পাটালি ভেঙে মুখে পুরে পরীক্ষা করছেন।

দরদাম হলেই গুড়ের কলসগুলো মাঠের এক পাশে সাজানো হচ্ছে। প্রতিটি কলসের গায়ে সাংকেতিক চিহ্ন দেখা হয়। বেপারিদের পাশাপাশি অনেকেই নিজের পরিবার ও স্বজনদের বাড়িতে পাঠাতে এ গুড় কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০ কেজি ওজনের প্রতি ভাঁড় ১০০০-১০৫০ টাকা এবং ১৫-১৬ কেজি ওজনের কলস এক হাজার ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। এছাড়া নলেন পাটালি প্রতি কেজি ১২০-১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ক্রেতাদের দাবি, মৌসুমের শুরুর দিকে অসাধু কিছু লোক গুড়-চিনি মিশিয়ে বিক্রির পাঁয়তারা করেন। তবে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়েছে। তাছাড়া গুড়ের দাম কমে যাওয়ায় ভেজাল মেশানো বন্ধ হয়ে গেছে।

কুতুবপুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের গাছি শুকুর আলী জানান, তার ৮০ টি খেজুর গাছ আছে । তিনি দীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করে ,এই হাটে বিক্রি করে আসছেন । এই খেজুরগাছ তাকে অনেক কিছু দিয়েছে ।

চুয়াডাঙ্গা সরোজগঞ্জ বাজার উন্নয়র কমিটির সভাপতি শেখ আব্দুল্লাহ জানান, চুয়াডাঙ্গাসহ আশপাশের পাঁচটি জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় গুড়ের হাট সরোজগঞ্জ। মৌসুমে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস সপ্তাহে দু’দিন এ হাট বসে। হাটের প্রতিদিন ১৮০ থেকে ২০০ টন খেজুড় গুড় ও পাটালি আমদানি হয়, যার বাজারদর প্রায় এক কোটি টাকা।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বরিশালসহ দেশের বড় বড় মোকাম থেকে বেপারিরা এখানে গুড় কিনতে আসেন। এছাড়া এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গুড় কিনে সারা দেশের মোকামগুলোতে পাঠায়।’

চুয়াডাঙ্গা মার্কেটিং অফিসার সহিদুল ইসলাম বলেন, এই হাটের সুনাম ধরে রাখার জন্য কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যাতে এই জেলা থেকে দেশের মানুষ ভালো গুড় ও পাটালি পায়।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আলী হাসান বলেন, ‘চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন এলাকার খেজুর গাছ থেকে সংগৃহীত রসে ২৮০ মেট্রিক টন খেঁজুর গুড় তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করা যায়, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি গুড় উৎপন্ন হবে এ মৌসুমে।’

তিনি আরও জানান, এখন এ জেলায় খেজুর গুড় তৈরির ভরা মৌসুম চলছে। চাষিরা গুড় ও পাটালি তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছেন, দামও ভালো পাচ্ছে। আর্থিকভাবে তাদের পরিবারে সচ্ছলতাও আসছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ভালো গুড় তৈরির জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। গুড়ের মানও ভালো। তবে কিছু অসাধু ব্যক্তি গুড়ে চিনি মেশাচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গার এই গুড়ের হাট অনেক প্রাচীন। ১৯৬০ সালের শেষের দিকে যশোরে ব্রিটিশদের গুড়ের কারখানা ছিল। সেখানে গুড় থেকে চিনি উৎপাদন হতো। সেগুলো ট্রেনে রপ্তানি হতো।

চুয়াডাঙ্গার পুরোনো বিডিআর ক্যাম্পের কাছে বসত গুড়ের হাট। সেখান থেকে নৌকা ও ঘোড়ার গাড়িতে করে খেজুড় গুড় চলে যেত পাবনা, সাভার, বরিশাল, ফরিদপুর গোয়ালন্দঘাটসহ বিভিন্ন হাটবাজারে। সেই ধারাবাহিকতায় এখনও এ হাট থেকে গুড় সারা দেশে পৌঁছে যায়।

Leave A Reply

Your email address will not be published.